বাংলাদেশ | জাতীয় প্রযুক্তি ও পরিবহন নগরী
ঢাকার শাহবাগে চালু হলো দেশের প্রথম এআই-চালিত স্বয়ংসক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল: স্মার্ট মেগাসিটির নতুন অধ্যায়
প্রকাশিত: ১৪ আগস্ট ২০২৬ | প্রতিবেদন: আরবান ট্রান্সপোর্ট ডেস্ক্রিপশন ও আইটি রিপোর্ট
রাজধানী ঢাকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অত্যন্ত ব্যস্ত মোড় শাহবাগে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে আধুনিক স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা (Automated Traffic Signal System)। বহু বছর ধরে ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশারায় ও ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে গাড়ি নিয়ন্ত্রণের যে প্রথা চালু ছিল, তা থেকে বেরিয়ে এসে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় প্রবেশ করল ঢাকা। এই উদ্যোগের মাধ্যমে ঢাকা শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থাকে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় আনার প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো।
১. শাহবাগ ইন্টারসেকশন কেন প্রথম পছন্দ?
শাহবাগ মোড়টি কেবল একটি সাধারণ সংযোগ সড়ক নয়; এটি ঢাকার কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও প্রশাসনিক কাঠামোর প্রাণকেন্দ্র। এর চারপাশে অবস্থিত দেশের সবচেয়ে বড় সরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (BSMMU), বারডেম জেনারেল হাসপাতাল, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চারুকলা অনুষদ এবং জাতীয় জাদুঘর।
প্রতিদিন হাজার হাজার শিক্ষার্থী, রোগী, ডাক্তার এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াতের কারণে এই মোড়ে প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হয় মারাত্মক যানজট। বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মুমূর্ষু রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সগুলো ম্যানুয়াল ট্রাফিকের কারণে প্রতিনিয়ত যানজটে আটকা পড়ে থাকে। নতুন সেন্সরভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন এই সিস্টেমে জরুরি যান শনাক্তকরণের মাধ্যমে রাস্তা দ্রুত ফাঁকা করে দেওয়ার বিশেষ অ্যালগরিদম যুক্ত করা হয়েছে, যা জীবন রক্ষায় বড় ভূমিকা রাখবে।
২. এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) সিগন্যাল প্রযুক্তি যেভাবে কাজ করবে
শাহবাগে ব্যবহৃত ট্রাফিক লাইটগুলো সাধারণ সময়-ভিত্তিক (fixed timer) ট্রাফিক লাইট নয়। এটি একটি সমন্বিত 'ইন্টেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম' (ITS) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত:
- রিয়েল-টাইম ট্রাফিক ডেনসিটি সেন্সর: চারদিকের প্রতিটি লেনে বসানো সেন্সর ও হাই-ডেফিনিশন ক্যামেরা গাড়ির ঘনত্ব সঙ্গে সঙ্গে হিসাব করে। যে লেনে গাড়ির লাইন দীর্ঘ, সেই লেনের সবুজ বাতি বেশি সময় অন থাকবে।
- ইমার্জেন্সি প্রাইওরিটি ওয়েভ (Emergency Wave): দূর থেকে সাইরেন বা অ্যাম্বুলেন্সের সিগন্যাল শনাক্ত করে সেন্সর স্বয়ংক্রিয়ভাবে লেন খালি করার সংকেত দেবে।
- অটোমেটিক নম্বর প্লেট রিকগনিশন (ANPR): প্রতিটি যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন প্লেট স্ক্যান করা হবে। ট্রাফিক সংকেত অমান্য করলে ই-মামলার কেস জেনারেট হয়ে যাবে।
- সেন্ট্রাল কন্ট্রোল রুম মনিটরিং: শহরের কেন্দ্রীয় সার্ভার থেকে সম্পূর্ণ শাহবাগ মোড়ের গতিবিধি সরাসরি লাইভ পর্যবেক্ষণ করবেন পুলিশ ট্রাফিক কমান্ড সেন্টার।
৩. অর্থনৈতিক সাশ্রয়, জ্বালানি ও কর্মঘণ্টার পরিসংখ্যান
গবেষণা অনুযায়ী, ঢাকা শহরের যানজটের কারণে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। শাহবাগের এই নতুন প্রযুক্তির ফলে যানবাহনের গড় অপেক্ষার সময় অন্তত ৩৫% থেকে ৪৫% হ্রাস পাবে।
গাড়ি একটানা অলস বসে না থাকার ফলে প্রতিদিন হাজার হাজার লিটার অহেতুক জ্বালানি তেল ও গ্যাসের অপচয় বন্ধ হবে। এতে বছরে কয়েকশত কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। একইসাথে ইঞ্জিন আইডিলে না থাকায় বায়ুতে কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে কমে আসবে।
৪. দেশব্যাপী সম্প্রসারণ ও বৈশ্বিক মানদণ্ড
শাহবাগের সফল পাইলট প্রজেক্টের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে রাজধানী ঢাকার আরও ৫০টি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে (যেমন: ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, মহাখালী, বিজয় সরণি, বাংলামোটর, গুলশান ও মতিঝিল) আগামী এক বছরের মধ্যে এই প্রযুক্তি যুক্ত করার মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সিঙ্গাপুর, লন্ডন, টোকিও কিংবা সিউলের মতো স্মার্ট সিটিগুলোতে বহু বছর ধরে এ জাতীয় 'স্মার্ট আর্টারিয়াল ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট' ব্যবহার করা হচ্ছে। ঢাকার বুকে এই পরিবর্তন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বাংলাদেশকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে।
৫. চালক ও পথচারীদের জন্য কঠোর আইন ও ই-মামলা ব্যবস্থা
এখন থেকে সড়ক পরিবহন আইন মেনে চলা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কোনো চালক ট্রাফিক সংকেত ভঙ্গ করলে সিসিটিভি ক্যামেরা গাড়ির ছবি তুলে নিবে এবং ই-ফাইন তৈরি হয়ে সরাসরি গাড়ির মালিকের মোবাইলে এসএমএস আকারে চলে যাবে।
কঠোর নিয়ম ও নির্দেশনা:
১. স্টপ লাইন মার্জিন: লাল বাতি জ্বললে গাড়ি অবশ্যই স্টপ লাইনের পেছনের সীমানায় থামাতে হবে। লাইন অতিক্রম করলেই স্বয়ংক্রিয় মামলা ইস্যু হবে।
২. পথচারী নিরাপত্তা: পথচারীদের জন্য ডিজিটাল পেডেস্ট্রিয়ান বাতি সবুজ হলে যানবাহন সম্পূর্ণ থমকে দাঁড়াবে।
৩. লেন শৃঙ্খলা: ইচ্ছামত লেন পরিবর্তন করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা বা দ্রুত ওভারটেক করার চেষ্টা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ বলে গণ্য হবে।
উপসংহার
শাহবাগে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল চালু হওয়া একটি যুগের পরিবর্তন। আধুনিক প্রযুক্তি ও সুশীল সমাজের সুশৃঙ্খল আচরণের মেলবন্ধন ঘটলে ঢাকা শহরের যানজট নিরসনে এটি নতুন আশার আলো দেখাবে।