বাংলাদেশ | শিল্প দুর্ঘটনা ও জরুরি আপডেট
সীতাকুণ্ডের জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে অন্তত ৯ শ্রমিকের করুণ মৃত্যু: উদ্ধার অভিযান ও তদন্ত শুরু
আপডেট: ১৪ আগস্ট ২০২৬ | প্রতিবেদন: ক্রাইম ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেস্ক
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে উপকূলীয় এলাকায় অবস্থিত একটি জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডে (Shipbreaking Yard) স্ক্র্যাপ জাহাজের ভেতর কাজ করার সময় বিষাক্ত বিষাক্ত গ্যাসের সংস্পর্শে এসে অন্তত ৯ জন শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এই দুর্ঘটনায় আরও বেশ কয়েকজন শ্রমিক গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, যাদের উদ্ধার করে নিকটস্থ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
১. যেভাবে ঘটল দুর্ঘটনা
স্থানীয় ও উদ্ধারকারী সূত্রে জানা গেছে, একটি স্ক্র্যাপ জাহাজের ইঞ্জিন রুম এবং বিষাক্ত ট্যাঙ্কার অংশের কাটিং কাজ করার সময় এই ভয়াবহ ঘটনা ঘটে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা চেম্বার খোলার সাথে সাথেই সেখানে জমা হওয়া বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড এবং মিথেন জাতীয় বিষাক্ত গ্যাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম ও মাস্ক না থাকায় জাহাজের ভেতরে কর্মরত শ্রমিকরা নিমিষেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন এবং শ্বাসরুদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই ৯ জনের মৃত্যু হয়। ফায়ার সার্ভিস এবং স্থানীয় কোস্ট গার্ড সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করেন।
২. আহতদের চিকিৎসা ও হাসপাতালে তৎপরতা
আহত শ্রমিকদের উদ্ধার করে জরুরি ভিত্তিতে ভর্তি করা হয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে ফুসফুস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেকেরই দ্রুত অক্সিজেন সাপোর্ট প্রয়োজন হচ্ছে।
৩. তদন্ত কমিটি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রশ্ন
ঘটনার খবর পেয়ে জেলা প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিস উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার আসল কারণ উদ্ঘাটন এবং ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের গাফিলতি রয়েছে কি না, তা যাচাই করতে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করার ঘোষণা দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ— জাহাজের চেম্বারে কাজ শুরুর আগে কোনো ‘গ্যাস ফ্রি সার্টিফিকেট’ (Gas-free Certificate) দেওয়া হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে চরম অনিশ্চয়তা রয়েছে। নিরাপদ কাজের পরিবেশ ছাড়া শ্রমিকদের জাহাজের বিষাক্ত চেম্বারে প্রবেশ করানোর বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পরিবেশ ও শ্রমিক অধিকার কর্মীরা।
৪. সীতাকুণ্ডে ঘনঘন দুর্ঘটনা ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
সীতাকুণ্ডের জাহাজ ভাঙা শিল্পে দুর্ঘটনা কোনো নতুন ঘটনা নয়। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও পরিবেশ সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের এই শিল্পে নিরাপদ গ্রিন শিপব্রেকিং (Green Shipbreaking) পলিসি বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়ে আসছে। কিন্তু কার্যকর তদারকির অভাবে দুর্ঘটনা ও শ্রমিক মৃত্যুর মতো ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটেই চলেছে।
জরুরি নিরাপত্তা ব্যবস্থা সংক্রান্ত নির্দেশনা:
১. টেস্ট রান জরুরি: জাহাজের স্ক্র্যাপ ট্যাংক বা ইঞ্জিন রুমে প্রবেশের পূর্বে এয়ার কোয়ালিটি ও গ্যাস ডিটেক্টর দিয়ে লেভেল পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা।
২. সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহার: সকল শ্রমিকের অক্সিজেন মাস্ক, গ্লাভস ও হেলমেট নিশ্চিত করা।
৩. কঠোর আইনি ব্যবস্থা: ফিটনেস ও গ্যাস-ফ্রি সনদ ছাড়া কাজ চালু রাখা ইয়ার্ডের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
উপসংহার
সীতাকুণ্ডের এই দুঃখজনক দুর্ঘটনা পুনরায় মনে করিয়ে দেয় যে শিল্পকারখানা ও শিপব্রেকিং ইয়ার্ডগুলোতে শ্রমিকের জীবন রক্ষায় কঠোর আইন প্রয়োগের আর কোনো বিকল্প নেই। দ্রুততম সময়ে নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন ক্ষুব্ধ স্বজন ও সহকর্মীরা।